মাখরাজের বিবরণ: কুরআন শিক্ষার সঠিক উচ্চারণের নিয়মাবলী জানুন
কুরআন মাজীদ আল্লাহ তাআলার কালাম। এই কালাম যেমন অর্থের দিক থেকে মহান, তেমনি এর উচ্চারণ ও তিলাওয়াতের পদ্ধতিও ইবাদত। কুরআন সঠিকভাবে পড়ার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো মাখরাজ (مخرج)—অর্থাৎ প্রতিটি হরফ কোথা থেকে ও কীভাবে উচ্চারিত হবে, তা জানা ও প্রয়োগ করা।
এই প্রবন্ধে আমরা সহজ ভাষায় মাখরাজের অর্থ, প্রয়োজনীয়তা, প্রকারভেদ এবং প্রতিটি হরফের উচ্চারণের স্থান বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো—যাতে নতুন শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নিয়মিত তিলাওয়াতকারী সবাই উপকৃত হন।
মাখরাজ কী?
মাখরাজ শব্দের অর্থ হলো নির্গমনের স্থান। তাজবিদের পরিভাষায়—
যে নির্দিষ্ট স্থান থেকে কোনো আরবি হরফ উচ্চারিত হয়, সেই স্থানকে মাখরাজ বলা হয়।
সহজভাবে বললে, মুখ, জিহ্বা, ঠোঁট, গলা—এই অঙ্গগুলোর কোন জায়গা ব্যবহার করে কোন হরফ বের হয়, সেটাই তার মাখরাজ।
মাখরাজ শেখা কেন জরুরি?
১. কুরআনের শব্দের অর্থ বিকৃত হওয়া থেকে রক্ষা করে
২. নামাজ ও তিলাওয়াত শুদ্ধ হয়
৩. রাসূল ﷺ যেভাবে কুরআন পড়েছেন, সেই সুন্নাহ অনুসরণ করা যায়
৪. তিলাওয়াতে খুশু ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়
একটি হরফ ভুল উচ্চারণ হলে অর্থ পর্যন্ত বদলে যেতে পারে—এজন্য মাখরাজ শেখা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং প্রয়োজনীয়।
মাখরাজের মোট সংখ্যা
তাজবিদবিদদের মতে মাখরাজের সংখ্যা ৫টি প্রধান স্থান, আর সেখান থেকে ১৭টি উপ-মাখরাজ বের হয়েছে।
আমরা সহজ বোঝার সুবিধার জন্য প্রথমে ৫টি প্রধান মাখরাজ জানবো।
১. আল-জাওফ (الجوف) — মুখগহ্বর
মাখরাজের স্থান: মুখের ভেতরের ফাঁকা জায়গা (গলা থেকে ঠোঁট পর্যন্ত)
এখান থেকে যে হরফগুলো বের হয়:
- ا (আলিফ) সাকিন, আগে ফতহা
- و (ওয়াও) সাকিন, আগে যাম্মা
- ي (ইয়া) সাকিন, আগে কাসরা
👉 এগুলোকে বলা হয় হুরূফে মাদ। এগুলোর উচ্চারণে কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গ স্পর্শ করে না; শব্দ টেনে বের হয়।
২. আল-হালক (الحلق) — গলা
গলা থেকে উচ্চারিত হরফগুলো তিন ভাগে বিভক্ত:
ক) গলার নিচের অংশ (أقصى الحلق)
- ء (হামযা)
- هـ (হা)
খ) গলার মাঝখান (وسط الحلق)
- ع (আইন)
- ح (হা)
গ) গলার উপরের অংশ (أدنى الحلق)
- غ (গইন)
- خ (খ)
👉 এই হরফগুলো উচ্চারণে গলার স্পষ্ট ব্যবহার হয়। অনেক শিক্ষার্থী এখানে বেশি ভুল করে থাকেন।
৩. আল-লিসান (اللسان) — জিহ্বা
সবচেয়ে বেশি হরফ জিহ্বা থেকে উচ্চারিত হয়। জিহ্বার বিভিন্ন অংশ ও মুখের ছাদের সঙ্গে সংযোগে এই হরফগুলো বের হয়।
উদাহরণ হিসেবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ:
- জিহ্বার গোড়া: ق، ك
- জিহ্বার মাঝখান: ج، ش، ي
- জিহ্বার এক পাশ: ض
- জিহ্বার ডগা: ت، د، ط، س، ص، ز، ر، ل، ن
👉 জিহ্বার সামান্য এদিক-ওদিক হলে উচ্চারণ বদলে যায়—তাই এই অংশে বেশি অনুশীলন প্রয়োজন।
৪. আশ-শাফাতান (الشفتان) — ঠোঁট
ঠোঁট থেকে উচ্চারিত হরফ:
- ف (নিচের ঠোঁট ও উপরের দাঁত)
- ب، م، و (দুই ঠোঁট)
👉 বিশেষ করে ب ও م উচ্চারণে ঠোঁট বন্ধের মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ।
৫. আল-খাইশুম (الخيشوم) — নাক
এটি কোনো নির্দিষ্ট হরফ নয়, বরং নাকের ভেতরের ফাঁকা অংশ।
👉 গুন্নাহ (نّ، مّ) উচ্চারণের সময় নাক থেকে শব্দ বের হয়।
গুন্নাহ ছাড়া তিলাওয়াত অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
মাখরাজ শেখার সহজ কৌশল
১. ধীরে ধীরে, আয়নার সামনে অনুশীলন করুন
২. একজন শুদ্ধ ক্বারী বা উস্তাদের কাছ থেকে শুনে শিখুন
৩. অডিও–ভিডিও রেকর্ড করে নিজের তিলাওয়াত যাচাই করুন
৪. একসাথে সব না শিখে, প্রতিদিন ২–৩টি হরফ নিয়ে কাজ করুন
উপসংহার
মাখরাজ হলো কুরআন শিক্ষার ভিত্তি। তাজবিদের অন্যান্য নিয়ম কার্যকর হয় তখনই, যখন হরফ সঠিক মাখরাজ থেকে বের হয়। আমরা যদি সত্যিই কুরআনকে সম্মান করতে চাই, তবে তার প্রতিটি হরফ যথাযথভাবে উচ্চারণ করার চেষ্টা করা আমাদের দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন শুদ্ধভাবে পড়া, বোঝা ও আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
কুরআন শিক্ষা ও তাজবিদ বিষয়ক লেখা নিয়মিত পেতে ভিজিট করুন: siddiqurrahman.com